বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেব উদ্ধৃত করে একটি দৈনিক রিপোর্ট করেছে : গত ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ২১৬ গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে। এই গৃহকর্মীরা সবাই শিশু। আর আহত হয়েছে শত শত। এদের মধ্যে ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার। গত দশ বছরে গৃহকর্মী নির্যাতনের বিচার হয়েছে এমন নজির নেই। এদের রক্ষারও কেউ নেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চাপে ২০০৮ সালে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ আচরণ বিধিমালার খসড়া শ্রম মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত করলেও এর অনুমোদন প্রক্রিয়া ঝুলে আছে। ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী ও মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির বলেছেন, শিশুশ্রমিক রাখা বেআইনী। কিন্তু এরপরও বিপুলসংখ্যক শিশুশ্রমিকের কাজে নিয়োজিত থাকবার বিষয়টি বলে দেয়, দারিদ্র্যের কারণে শিশুরা শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে। শিশুশ্রম বন্ধে ক্ষমতাসীনরা নানা উদ্যোগের কথা বললেও কাজের কাজ কিছুই হয় না। এছাড়া দেশের বিপুল উন্নয়নের কথা বলা হলেও ভেতরে ভেতরে গাঢ় অন্ধকার জগদ্দলপাথর হয়ে চেপে আছে। সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, বাংলাদেশের ৩ কোটি মানুষ এখনও তিনবেলা পেটপুরে খাবার পান না। অর্থাৎ এসব মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিনযাপন করেন। বিশেষত গ্রামের জেলে, শ্রমিক, ভূমিহীন, গৃহহীন মানুষ দিনে তিনবেলা খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খান। এক বেলা কোনও রকমে খাবার জোগাড় হলে আরেক বেলা আধাপেট খেয়ে কিংবা অনাহারে কাটাতে হয়। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার কথা এ অবস্থায় মাথায়ও আসে না অনেকের। পেটের ভাত জোটানো না গেলে, মাথা গুঁজবার ঠাঁই না থাকলে বাচ্চাদের স্কুলে দেবার চিন্তা ওদের কীভাবে হবে? দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী এসব মানুষের স্বাস্থ্যরক্ষারও কোনও নিশ্চয়তা নেই বললেই চলে। নদীভাঙন, সিডর, আইলা বিধ্বস্ত এলাকার মানুষ এমনই দুর্বিষহ অবস্থায় দিনযাপন করছেন।
দেশের তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে বসবাস করছেন বাধ্য হয়ে। তাদের খাদ্য ও বাসস্থানের সংস্থান অপ্রতুল। কাজও পান না ঠিকমতো। লেখাপড়ার অভাবে তেমন কাজের যোগ্যতাও নেই এসব লোকের। এদেরই নারী-শিশুরা অবস্থাবানদের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত হয়। বিশেষত দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারীদের মেয়েশিশুরা শহরে এসে সাহেবদের বাড়িতে কাজে নিযুক্ত হয়। এদের বয়সও কম থাকে। দশ- বারো বছর বয়স হবার আগেই দরিদ্র অভিভাবক শিশুর খাবারের নিশ্চয়তা ও মাসে মাসে কিছু টাকা পাবার আশায় শহুরে বাড়িতে ঝিয়ের কাজে লাগিয়ে দেন। অথচ শিশুটি জানেই না তার পরিণতি কী হতে পারে। গ্রাম থেকে শহরে এসে দশ-বারো বছরের শিশুটি কিছুই বোঝে না। কাজ করবে কী? অনেক সময় সাহেবদের কথাও বুঝতে পারে না ভালোভাবে। কাজ ভালোভাবে করা তো দূরের কথা। তাই হতে হয় নির্যাতনের শিকার। একশ্রেণির বেগম-সাহেবরা অবুঝ শিশুটির ওপর শুরু করে অমানবিক নির্যাতন। খুন্তির ছেঁকা ও গরম পানি গায়ে ঢেলে পুড়িয়ে দেবার মতো নির্মম ঘটনাও ঘটিয়ে থাকেন শহরের কোনও কোনও বেগম-সাহেব। অন্যদিকে মেয়ে শিশুটির শরীর একটু ভালো ও রঙচঙা হলে একশ্রেণির সাহেব কিংবা বাড়ির ছেলেদের কুনজর পড়ে মেয়েশিশুটির প্রতি। অল্পদিনের মধ্যেই বাড়ির সাহেব কিংবা বখাটে ছেলেদের জৈবিক চাহিদা মেটাতে হয় এই মেয়ে শিশুটিকে। আপসে রাজি না হলে শারীরিক নির্যাতনও চলে নানা কৌশল ও অজুহাতে। শেষমেষ জীবনটাও বাঁচে না অনেক মেয়েশিশুর। এমনই বর্বরতা চলে সভ্যতার আবরণে ঢাকা অনেক শহুরে বাসাবাড়িতে। সব বাসাবাড়িতে সব সাহেব কিংবা তাদের সন্তানেরা এমন লোমহর্ষক ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন, তা নিশ্চয়ই নয়। কিন্তু মোটামুটি পাঁচ বছরের শিশু গৃহকর্মী নির্মমতার শিকার হয়ে মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান দিয়েছে ‘বিলস’ নামের সংস্থাটি তাও কিন্তু কম নয়। যদিও বাস্তবত এ সংখ্যা আরও অনেক বলে আমাদের ধারণা।
আসলে মানুষের মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ না হলে সমাজে নানা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ন্যায়-অন্যায় বোধ মানুষের হ্রাস পায়। নৈতিকতা বিলুপ্ত হতে থাকে। পেটের জ্বালায় প্রিয় সন্তান পর্যন্ত অন্যের হাতে তুলে দেবার মতো অমানবিক কাজ করতে অভাবী মানুষ বাধ্য হন। এরই সুযোগে একশ্রেণির মানুষরূপী পশু নারীশিশুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জৈবিক চাহিদা পূরণে আগ্রাসী হয়ে ওঠে। কাজেই এসব পশুর যেমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার, তেমনই মানুষ যাতে নিজের সন্তানকে অন্যের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত করাতে বাধ্য না হন, সেজন্য তার দারিদ্র্য নিরসনেরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে সরকার ও সমাজ পরিচালকদের যথাসম্ভব এবং দ্রুত

0 comments: